চারের উত্তর-পূর্ব ঘটনাবলী – এনামুল রেজা
Reading Time: 7 minutes

সব হারায় নাই, অজেয় ইপ্সা এবং প্রতিশোধের পাঠ, অনিঃশেষ ঘৃণা, কভু পরাজয় স্বীকার না করবার অহং।

—জন মিল্টন, প্যারাডাইস লস্ট

ঠিক এমন ভাবে লোকটা শুয়ে আছে যেন একটা লাশ পড়ে আছে চিতিয়ে, এরপর মনে হবে ওইতো ডান চোখের পাতাটা কেঁপে উঠলো—নিশ্চয় স্বপ্ন দেখছে, খুব ভয়ানক কোন স্বপ্ন যেমন শনিবারের ছুটি ফুরোবার শেষরাত্তিরে চাকুরে লোকজন দেখে (গ্লাসের পর গ্লাস পানি খাওয়া হচ্ছে, কিন্তু তৃষ্ণা মিটছেনা এ জাতীয় স্বপ্ন)। তারপর কোত্থেকে এক ঘিয়ে কুকুর এসে লোকটাকে শুঁকে যাবে, কিছু ডাঁশমাছি মুখের উপর পালা করে উড়তে থাকবে—সমস্ত মিলিয়ে এই প্রায় বিজন রেলস্টেশনে লাশটি আবিষ্কার করে এক অমোচনীয় অসহায় বোধে ডুবে যাবেন আপনি। ডানে বামে তাকিয়ে দেখবেন দূর থেকে কেউ চেয়ে আছে যার দাঁড়াবার ভঙ্গিটি সন্দেহজনক—সিদ্ধান্ত নিতে মস্তিষ্ক দ্বিধায় পড়বে: দ্রুত অন্যকোথাও সরে যেতে চাইবেন আবার এক অজানা মমতায় লাশটির প্রাণহীন অস্তিত্ব আপনাকে আঁকড়ে ধরবে।

ছেলেটির বয়স কত? দশ এগারো? সে কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল হবেনা—কিন্তু তাকে আবিষ্কার করে একটু স্বস্তি পাবেন, জানতে চাইবেন: “চিনিশ একে? কে বলতো? স্থানীয় কেউ না যাত্রী?”

জানিনা।

মরে গেল নাকি?

জানিনা।

তুই কে? কোথায় থাকিস?

ছেলেটি আঙুল তুলে অদূরের নদীতে তাক করলে আপনার হঠাৎ খুব বিরক্ত লাগবে। মনে হবে আজব এলাকায় এসে পড়েছেন—চারদিকে যেন মানুষ নয়, মানুষের ছায়ার বসবাস। নিকটের সিমেন্ট মোড়া বেঞ্চিতে বসে কেমন ভয় করবে, লাশটির দিকে একবার চাইবেন, নদীর দিকে তাকাবেন এরপর আকাশে, সেখানে ফ্যাকাশে মেঘের গায়ে অজানা কেউ ঝাড়ু টেনেছে। শহরের নিরাপদ খোড়ল ছেড়ে এভাবে আপনার চলে আসবার কী মানে ছিল? কেউ কি বাতাসে নিমন্ত্রণ পাঠিয়ে দিয়েছিল যে, চলুন পাহাড়ে যাওয়া যাক। এ জন্মে পাহাড় না দেখে মৃত্যু মানে বৃথা মৃত্যু, ওপারে স্বর্গ-নরক যাই থাকুক—পৃথিবীর বিস্ময়কর সবুজ পেরেকিয়া পাহাড়গুলো সেখানে না মিলবারই কথা?

হঠৎ কারও ডাকে ঘোর ভাঙবে।

বাবা, আমাকে চিনেছেন?

একটি ভরাট মুখ, মুখভর্তি সফেদ দাড়ি, পরনে হলদেটে হয়ে আসা কুঞ্চিত পাঞ্জাবি আর পলিস্টারের সবুজ লুঙ্গি—একে কোন মতেই চিনবার কথা নয় তবু খেয়াল করে দেখবেন, হতেই পারে এ বৃদ্ধটির সাথে আসবার পথে কোথাও বাসে কিংবা ট্রেনে কিংবা ট্রলারে নদী পেরুতে দেখা হয়েছিল।  জবাবের অপেক্ষা না করেই বৃদ্ধ লোকটি পাশে বসে পড়বে, হাতে ধরা চটের ব্যাগ রাখবে আপনার এবং তার মাঝখানের শূন্যস্থানে—সেখান থেকে খানিক পর বেরুবে পানের বাটা, একখিলি তৈরি পান—পান মুখে পুরে লোকটা উদাস দৃষ্টিতে অদূরে পড়ে থাকা লাশটি নিয়ে কথা পাড়বে।

ওনাকে চিনেছেন বাবাজি?

জ্বি না।

কতক্ষণ ধরে এখানে বসে আছেন?

মেলাক্ষণ, দুপুর তিনটা থেকে।

বিকাল পাঁচটার ট্রেন আপনার?

জ্বি।

ওনাকে আপনি চেনেন না কেন?

আশ্চর্য! আমি কিভাবে চিনবো?

এখন ছেলেটিকে দ্বিতীয়বার আবিষ্কার করে চমকে উঠবেন আপনি, নিঃশব্দে এসে আবার কখন বসেছে পাশে: আদুল গা, চুল এলোমেলো, ফর্সা এবং রোগা, চোখ দুটি আশ্চর্য উজ্জ্বল—জুতোহীন পা ধূসর হয়ে আছে ধুলোয় যেন বালুভর্তি ময়দান পেরিয়ে ইস্টিশনে এসেছে। খানিক নিচু কন্ঠে ছেলেটি আপনাকে জানাবে, আমি ওনাকে চিনি।

তখন যে বললি জানিনা?

তখন চিনতাম না।

এই এলাকার নাম মনে রাখবার চে’ প্রথমে গুরুত্ববহ মনে হয়েছিল প্রকৃতি। চারদিক ঘিরে বয়ে যাওয়া নদী, দৃষ্টি দূরে মেলে দিলে লিলুয়া পাহাড়, বহুপথ ভেঙে সে পাহাড়ে খানিক চড়লে দেখা যায় কাঁটাতারের বেড়া, ওপাশের ভিনদেশ। পাহাড় থেকে নেমে মাঝরাস্তায় পড়ে এক রহস্যময় হাঁটুপানির নদী, আপনি সে নদীতে নামলেন, বালুতে পা ডোবালেন এমনকি আঁজলা ভরে জীবনে প্রথমবার গিলে নিলেন স্বচ্ছ সুমিষ্ট সেই নদীর জল—তখন কি খেয়াল করেছিলেন আপনাদের মাথার উপর দিয়ে হাওয়া কাটছিল এক নাম না জানা কৃষ্ণবরণ পাখি?

এই পাখির গল্প আপনি শুনুন।

এক বিশাল শিরিশ বৃক্ষ যার সূচনাবিন্দু কেউ জানেনা, লোকে বলে একশ-দেড়শ বছরের পুরনো হবে—তার কোন অগভীর খোড়লে আরও তিনজন সহোদরের সঙ্গে পাখিটির জন্ম। একটি পাখি শাদা, একটি হলুদ, একটি সবুজ এবং সে নিজে কালো। জন্মের দ্বিতীয় দিনেই স্রষ্টা এদের পূর্ণবয়স্ক করে দিলেন, চারজনকে নির্দেশ দিলেন চারদিকে উড়াল দিতে। সুতরাং গাছের খোড়লে মা পাখিকে রেখে তারা চারজন চারদিকে উড়াল দিল—নতুন পৃথিবীর সন্ধানে।

এখন আপনি শুধু মনোযোগ দিন কালো পাখিটির গল্পে। কালো পাখি নিজের লক্ষ্যে উড়তে উড়তে পৌঁছে যায় মানুষের পৃথিবীতে, নিয়তির নির্দেশ যেহেতু সেরকমই ছিল। এই দু’পেয়ে প্রাণীগুলো মাংসভূক: সব রকমের মাংস খায়, সুতরাং পাখিটি এসে আশ্রয় নেয় একটি প্রাচীন দালানের চিলেকোঠায়, ভেবে নেয় যে জায়গাটি পরিত্যক্ত, কেউ থাকেনা। কিন্তু পাখিরাও ভুল করে।

হ্যাঁ, এখন আপনার অনেক কিছুই মনে পড়বে—মনে পড়বে যে উঠতি যৌবনে প্রায় পরিত্যক্ত এক চিলেকোঠায় বসবাস ছিল আপনার, ভাঙা ভেন্টিলেটরের ফাঁকায় এসে উঠেছিল কালো রঙা এক পাখি, প্রথমত নিঃসঙ্গ—আপনি জানতেন, জোড়া ছাড়া কখনই এরা বাসা বাঁধেনা কিন্তু এই পাখিটি বেঁধেছিল। ঘুমুতে যাবার আগে দেখতেন পাখিটি বাসায় নেই, কিন্তু ভোরবেলা সে ফিরে আসতো—শুনতে পেতেন তার ডানার অস্থির ছটফটানি অতঃপর দুপুর এলেই সে উড়াল দিত বাসা ছেড়ে আবার। অস্বীকার করতে পারবেন না যে, পাখিটির এই আধবেলা সঙ্গে আপনি বেশ আনন্দে থাকতেন, চিলেকোঠার খোলা দরোজা দিয়ে বাতাস আসলে সেই বাতাসের বাজনা আর কালো পাখিটির ডানার ঝটপটানি আপনার প্রতিটি সকালকে আনন্দময় করে তুলতো। এবং অবধারিতভাবে নিয়তি আপনার জন্য সিদ্ধান্ত পাঠায় এক মাঝরাতে, ঘুম ভেঙে জেগে ওঠেন—ভাবেন, এভাবে নয়, পাখিটিকে আপনার স্থায়িভাবেই দরকার: সারাদিন, চাইলেই যেন এর ডানার সঙ্গীত শুনতে পান, চাইলেই যেন এর সাথে কথা বলতে পারেন। এক অপার প্রতীক্ষা নিয়ে আপনি সারারাত্রি আর ঘুমান না, ভোরের অপেক্ষা করতে শুরু করেন—জীবনের সবচে’ দীর্ঘতম অপেক্ষা।

কিন্তু কালো পাখিটি আর কোনদিন আপনার চিলেকোঠায় ফিরে আসেনা। আপনি সেদিন থেকে জেনে যান: একটি অস্থায়ী অনিশ্চিত পৃথিবীতে কেউ স্থায়ীরূপে কোন কিছু চাইতে পারে না।

বিজন স্টেশনটি যেন ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে সমস্ত পৃথিবীর থেকে—সিমেন্টের বেঞ্চি থেকে উঠে হাঁটতে শুরু করেন। রেললাইনে হাঁটতে শৈশবে আপনার কেন ভয় করতো মনে পড়ে? সেই যে মগজের প্রকোষ্ঠে দৃশ্যটি জীবন্ত হয়ে উঠতো: রেললাইন ধরে একটি গ্রাম্য কিশোরী মেয়ে, সবুজ লালের চেকচেক শাড়ি পরে নেচে নেচে আসছে, তার চোখে অপার আনন্দ কিংবা কন্ঠে গান – “নীলসাগর পাড়ি দিয়ে তোমার কাছে এসেছি/ ভালবাসো নাইবা বাসো তোমায় ভালবেসেছি”, হঠাৎ রেল ক্রসিঙের কলকব্জার মাঝখানে তার পা আঁটকে যায়। যত টেনে ছাড়াতে চায় আতঙ্কিত কিশোরী, লোহার পাত আরও চেপে ধরে তার পায়ের মাংস।  বিজন রেলপথে তার চিৎকার কারও কানেই হয়তো পৌঁছে না—এমন সময় দূর থেকে হুইসেল শোনা যায়, ট্রেন আসছে।

আব্বাজি এরপর কী হয়? মেয়েটা ট্রেনে কাটা পড়ে?

আপনি অবাক হয়ে দেখেন নিঃশব্দে বৃদ্ধটিও পিছেপিছে হেঁটেছে এতক্ষণ ধরে। এই প্রথম অবাক লাগে না, বিরক্তিও আসেনা মনে—যেন ধরেই নিয়েছেন এ বিচিত্র রেলস্টেশনে ভেঙে ভেঙে পড়বে আপনার চেনা এতদিনকার জগত।

আমি জানিনা কাটা পড়ে কিনা।

আপনি জানেন। আমাদের বলেন সেই ঘটনা।

বলাবলির কিছু নেই।

নিশ্চয় আছে।

আছে?

হাঁটতে হাঁটতে পুনরায় রেল প্লাটফর্মের ছাউনিতে চলে আসেন আপনি আর বৃদ্ধ, সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে পড়েন। দেখেন ছেলেটি তখনও বসে আছে চুপচাপ—তার দৃষ্টি পড়ে থাকা মৃতদেহটির দিকে। আপনারা বসতেই সে বিড়বিড় করে: মেয়েটা ওদিন মরে না, কারণ বহু লোকজন চলে আসে আশপাশের গ্রাম থেকে। এক মাইল আগে থেকেই ট্রেনটিকে সিগনাল মেরে থামানো হয়। তবে মেয়েটি নিশ্চয় মরে, অন্য কোন দিন।

আপনি শুধু অবাক হননা, এক রকমের আতঙ্ক নিয়ে ছেলেটির দিকে চেয়ে থাকেন। যেন ও আপনার সমস্ত অতীত জেনে বসে আছে, যেন আপনার আপন আঁধারের সকল সুত্র তার মুখস্ত। এমন তো হতে পারেনা, সেই যে মেয়েটি রেললাইনে পা আঁটকে যাবার পরেও অলৌকিক ভাবে বেঁচে ফেরে নিজ গ্রামে, খুব পরিচিতি পেয়ে যায়—স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা তার কাছে শুধু গল্পটা শুনতে চাইতো, ক্লাসের ছেলেমেয়েরাও এমনকি তাদের বাসায় আত্মীয়- স্বজনের আনাগোনাও বেড়ে গেল হুট করেই, সবাই রেললাইনের গল্পটা শুনতে চায়।  কিশোরীটি যেখানে যেত, সবাই তার দিকে চেয়ে থাকতো আর এভাবে সে এক সময় আবিষ্কার করে নিজের আপন জগত বলে আর কিছু তার কাছে অবশিষ্ট নেই। সে গাঁয়ের পথে-ঘাটে আর ঘুরে-ফিরতে পারছেনা, রেললাইন দেখলেই ভীত হয়ে পড়ছে আর প্রতি রাত্তিরে স্বপ্ন দেখছে কেউ তার হাত-পা বেঁধে ফেলে দিয়েছে নদীতে, ধীরে ধীরে মাথায় ভোঁতা যন্ত্রণা শুরু হচ্ছে আর কালো একটা হাত এগিয়ে আসছে তার কন্ঠ বরাবর।

সন্ধ্যা নামে, মাগরিবের আজান চারপাশের পরিবেশকে কোন এক রহস্যময় আবেশে মশগুল করে তোলে—আপনি টের পান মানুষের আনাগোনা বাড়ছে, ট্রেন আসবে হয়তো কিছুক্ষণের মাঝেই। বৃদ্ধটি পানের পিক ফেলে অদূরে, তার ঘিয়ে ময়লাটে পাঞ্জাবীর বুকের কাছে ছিটাছিটা লালচে পিকের কণা ছড়িয়ে পড়ে। সেসবে ভ্রক্ষেপ না করেই বৃদ্ধ আপনার দিকে তাকায় – বাবাজী, একটা গোপন কথা বলি?

বলেন।

এই যে আজান হয়, নামাজ পড়তে যাই আসলে ভয়ে।

কিসের ভয়?

যৌবনে খুব বড় এক অপরাধ করেছিলাম, নামাজ পড়লে হয়তো আল্লাপাক অপরাধ কেটে নেবেন।

এখন আর অপরাধ করেন না?

জ্বি করি। যৌবনে যে অপরাধটা করেছিলাম, সেটা যে ভুলতে না পেরে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে কষ্ট দেই—এই অপরাধ। বাবাজী, আপনি কি আমার গল্পটা শুনবেন?

নামাজ পড়তে যাবেন না?

জ্বি না, আজ নামাজে যেতে ইচ্ছে করছেনা।

বৃদ্ধটি তার গল্পের ঝোলা খোলে সন্ধ্যার রহস্যময় আলোতে, ট্রেন তো আসছেনা—আপনাকে ভেবে নিতে হয় সময় পেরিয়ে যাবে, মন্দ কী?  কফ জড়ানো কন্ঠে বৃদ্ধ বলে যায়:

আমার বিয়ে হয় যখন, বয়স মাত্র বাইশ—যে মেয়েটির সাথে বিয়ে, সে এক গ্রাম্য কিশোরী। চিরকাল আমাদের খুব ক্ষমতাবান পরিবার, মফস্বল শহরে প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল বাপদাদার রমরমা চালের আড়তের কারণে। মোটামুটি বহু দূরের গ্রাম থেকেই মেয়েটিকে বিয়ে করে আনি বিশাল বরযাত্রী সাথে নিয়ে, গরীবের মেয়ে—মনে আছে সারা গ্রামের লোকজন ছুটে এসেছিল আমার শশুরবাড়ির ভাঙা টিনের চালার আঙ্গিনায়, বর কেমন এটা দেখতে। বিয়ের রাতে বাসর ঘরে ঢুকলাম—গুটিয়ে জড়োসড়ো বসে থাকা মেয়েটিকে দেখে ভীষণ উত্তেজনা শুরু হল আমার মাঝে। এই মেয়েটি আমার ধর্মপত্নী, তার সাথে যা ইচ্ছে তাই করবার অধিকার পেয়ে গেছি—এইরকমের মনোভাবে আচ্ছন্ন হয়ে এগিয়ে গেলাম। কিছুসময় বাদেই কানে এল হৈচৈ, ঘরের দরজার ওপাশ থেকে আব্বার শীতল কন্ঠস্বর – “আশরাফ, বাইরে আয়।“ সমস্ত শারিরীক ও মানসিক উত্তেজনা ভিতরে চাপা দিয়ে আমি প্রায় বিবস্ত্র মেয়েটিকে ছেড়ে খাট থেকে নামি, দরজা খুলে আব্বার পিছে পিছে হাঁটতে শুরু করি। বর্ষার সময়, টিপির টিপির বৃষ্টি পড়ছে দিনরাত্তির—বড়ঘর থেকে কাচারিতে যেতে যেতে সেসব জলের ফোঁটা সুঁচ হয়ে বিঁধে যাচ্ছে গায়। কাচারিঘরে গিয়ে দেখি, চেয়ারে প্রায় সমবয়সি এক যুবক বসে, চোখ দুটো রক্তবর্ণ, ক্লান্তিতে চোয়াল ঝুলে পড়েছে এমন অবস্থা। আব্বা বললেন – এ কী বলতে চায়, মন দিয়ে শোন। বিশেষত্বহীন চেহারার রুগ্ন যুবকটি এক গ্লাস পানি খায়, ক্লান্ত স্বরে বলতে থাকে, আমি শুনি আমার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর সাথে যুবকটির গোপন প্রণয়ের প্রকাশ্য বিবরণ, তাদের একসাথে পালিয়ে যাবার পরিকল্পনা ভেস্তে যাবার করুণ কাহিনী এবং আমার সাথে তার প্রেমিকার বিয়ে। সত্য করে বলি, আমার জগতে আর কিছুই কামড় বসাতে পারেনা একটা বিষয় ছাড়া—সামনে বসে থাকা যুবকটি আমার বউয়ের সাথে সঙ্গম করছে এমন এক দৃশ্যে কেঁপে উঠতে থাকি প্রতি মুহূর্তে। খুব বেশিক্ষণ স্বাভাবিক দাঁড়িয়ে থাকা অবশ্য সম্ভব হয়না, ক্লান্ত ও ভীত যুবকটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ি, যেন তার কন্ঠ চেপে ধরবো কিংবা তার চোখ গেলে নেব অথবা তার মাথাটা গুঁড়িয়ে দেব কোন শক্ত পাথরের আঘাতে—কেউ বাধা দিতে এগিয়ে আসেনা। খানিকবাদে নিজ হাতে তৈরি মৃত দেহটি ছেড়ে উঠে পড়ি আমি, কাচারি ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করি বড়ঘরের দিকে, বাধা আসে তখন—আব্বা আমার হাত চেপে ধরেন, ফিসফিসিয়ে বলেন – আপদ বিদায় করেছিস ভাল, কিন্তু বংশের ইজ্জতের কথা তোকে ভাবতে হবে, এই মেয়ের সাথে সংসার করা ছাড়া তোর উপায় নেই।

এটুকু বলে বৃদ্ধটি দম নেয়, কুপির আলো জ্বালিয়ে কেউ ছোলাবুট বিক্রি করছে—সেদিকে তাকিয়ে কয়েকটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আপনি বিস্ময় নিয়ে বৃদ্ধটির সেই দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ শোনেন, এ বিস্ময় একটা শীতল চাদরের মত গায়ে শক্ত হয়ে এঁটে যেতে থাকে—চাইলেও সরানো যায়না।

আপনি খুনী?

বাবাজী আমি তার চে’ও বড় অপরাধী।

কী বলেন?

জ্বি। ওই রাতের পর থেকে এক অন্ধ আক্রোশে আমি আমার বউকে ধর্ষণ করতে থাকি—তার সাথে প্রতিবার মিলিত হওয়াটাকে যেন মনে হয় এক পৈশাচিক ব্যাপার, অল্প বয়সি কিশোরীটিকে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলার মনোবাসনা দিনের পর দিন বয়ে বেড়াই এমনকি সে যখন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে, আমার ভিতরের জন্তুটি আরও বেপরোয়া হয়—বারংবার মনে হতে থাকে তার গর্ভের শিশুটি সেই যুবকের সুতরাং আমি চাই সমস্ত কিছু খতম করে ফেলতে।

নিজের স্ত্রীকেও খুন করেন?

চারপাশে লোকজনের মাঝে অস্থিরতা টের পান আপনি—একমাত্র চোখটায় আগুন জ্বেলে ট্রেন আসছে, দূর থেকে ওই দেখা যায় জম্পেশ আলোর বন্যা, দুপাশের গাছপালায় ঝড়। বৃদ্ধটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ছোলাবুট অলার দিকে পুনরায় মনোযোগী হয়, খানিক আগের বিস্ময়ের চাদরটি হয়ে দাঁড়ায় অস্বস্তির মত—আপনি প্রশ্নটা কয়েকবার করেন, এরপর কী হল, এরপর? কিন্তু মনে হয় ছোলাবুট অলার কেরোসিন ল্যাম্পের দগদগে মোটা শিখায় থেমে গিয়েছে পৃথিবীর সবচে’ নিঃসঙ্গ লোকটির দৃষ্টি।

হুইসেল বাজিয়ে বিকট ও প্রাচীন ট্রেনটি রেল পাটাতনে প্রবেশ করে। নিথর লাশটিকে ছাড়িয়ে অজস্র মানুষ ওর দিকে ছুটে যায়, যেন রেলগাড়িটি সারাদেহে অজস্র মুখঅলা এক অজগর—গাদাখানিক লোককে উগ্রে দিয়ে নতুন আরও গাদাখানিক মানুষের পাল সে গিলে নেবে। তুমুল হৈচৈ, ভিড়ের মাঝে ছেলেটিকে আর কোথাও খুঁজে পাননা যে দেখিয়েছিল তার বসবাস নদীতে কিংবা অন্যকোথাও—যার কাছে জমা ছিল আপনার একান্ত গোপনীয়তার দলিল, হারিয়ে গেল। ট্রেনে উঠবার আগে আপনার মনে হয়, স্বর্গপতনের পর থেকে মানুষ চিরকাল শুধুমাত্র নিজের কাছেই ফিরতে চেয়েছে।

-০-