হাতের পাতায় গল্পগুলো মূলঃ ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা [১৯২৫] বাঙলায়নঃ কল্যাণী রমা 
Reading Time: 3 minutes

[ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা ১৯৬৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। স্নো কান্ট্রি’, ‘থাউজ্যান্ড ক্রেনস’, ‘দ্যা সাউন্ড অফ দ্যা মাউন্টেনউপন্যাসগুলোর জন্য বিখ্যাত হলেও কাওয়াবাতা নিজে বলতেন তাঁর শিল্পকে সত্যিকারভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে হাতের পাতায় এঁটে যাওয়া এই সব ছোট ছোট গল্পে। ১৯২৩ থেকে শুরু করে ১৯৭২-এ আত্মহত্যা করবার কিছু আগে পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন হীরের কুচির মত এমন অনেক গল্প। এই গল্পগুলো স্বপ্নের মত, কুয়াশার মত। সময়ের মত, মৃত্যুর মত। …একাকীত্ব, ভালোবাসা আর অনুভূতির সূক্ষ্ণতায় কবিতার মত।]

মৃত মুখের ঘটনাটুকু

“হ্যাঁ, এসে দেখে যাও, এই অবস্থা হয়েছে ওর। ওহ্‌, কী ভীষণই যে ও তোমাকে আর একবার দেখতে চেয়েছিল।” লোকটির শাশুড়ি তাকে তাড়াহুড়ো ক’রে ঘরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল। তার স্ত্রীর বিছানার পাশের সব মানুষ একইসাথে তার দিকে তাকাল।

“একবারটি ওকে দেখ।” তার শাশুড়ি স্ত্রীর মুখ ঢেকে রাখা কাপড়টা সরাতে সরাতে আবার বলে উঠল।

হঠাত্‌ লোকটি বলে উঠল। “আমি কি ওকে একটু একা দেখতে পারি? তোমরা সবাই এই ঘরে ওর সাথে আমাকে একটু একা থাকতে দেবে?”

লোকটির কথায় স্ত্রীর পরিবারে সহানুভূতি জেগে উঠল। ওরা ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। স্লাইডিং দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে।

সে সাদা কাপড় সরিয়ে দিল।

তার স্ত্রীর মুখ মৃত্যুতে, বেদনায় শক্ত হ’য়ে গেছে। গালগুলো ভিতরে ঢুকে গেছে, বিবর্ণ দাঁতগুলো ঠোঁটদু’টোর মাঝ থেকে ঝুলে আছে। চোখের পাতার মাংস শুকিয়ে চোখের মণিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। কপালে এক স্পষ্টত প্রতীয়মান টান টান উত্তেজনা সেই ব্যথাকে জমাট ক’রে রেখেছে।

সে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হ’য়ে বসে থাকল। মৃতের বিশ্রী মুখটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।

তারপর, কাঁপা কাঁপা হাতদু’টো সে স্ত্রীর ঠোঁটের উপর রাখল। মুখটা বন্ধ করবার চেষ্টা করল। কিন্তু জোর ক’রে ঠোঁটদু’টো বন্ধ রাখতে চেষ্টা করতে গিয়ে দেখে হাত সরিয়ে নিলেই ঠোঁটদু’টো আবার নিস্তেজ হ’য়ে খুলে যাচ্ছে। আবার মুখটা বন্ধ করল সে। আবার খুলে গেল মুখ। বারবার এমন ক’রেও সফল হওয়া গেল না। কিন্তু দেখা গেল স্ত্রীর মুখের চারপাশ ঘিরে যে কঠিন রেখাগুলো ছিল তা যেন নরম হ’তে শুরু করেছে।

তখন সে আঙ্গুলের ডগায় যেন এক ক্রমশ বেড়ে ওঠা কামনা অনুভব করতে থাকল। সে স্ত্রীর কপালে আঙ্গুল ঘষে ঘষে সব উদ্বেগ, সব দুশ্চিন্তা দূর ক’রে দেওয়ার চেষ্টা করল। তার হাতের তালু গরম হ’য়ে উঠল।

আর একবার চুপ ক’রে বসে থেকে সে এই নতুন মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকল।

স্ত্রীর মা এবং ছোটবোন ভিতরে আসল। “তুমি নিশ্চয়ই ট্রেনজার্নি ক’রে ক্লান্ত। দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নাও…ওহ্‌!”

মার দু’চোখ বেয়ে হঠাত্‌ জল গড়িয়ে পড়ল। “মানুষের আত্মা এক ভয়ংকর জিনিষ। তুমি ফিরে না এলে ও পুরোপুরি মারা যেতে পারছিল না। কী আশ্চর্য। তুমি ওর দিকে শুধু একবার তাকিয়েছ আর ওর মুখ কী অদ্ভুত শিথিল, নরম হ’য়ে গেছে…ঠিক আছে। এখন সব ঠিক আছে।”

স্ত্রীর ছোটবোনের চোখগুলোতে এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য ভাসছে। সে তার দিকে তাকাল। রাগ ঝরে পড়ছে সে চোখে।  তারপর মেয়েটিও কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।

যে মেয়েটি আগুন ছুঁতে গিয়েছিলো

দূরে হ্রদের জল ঝিলমিল করে উঠলো। এক জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া সন্ধ্যায়, এক পুরানো বাগানে, এক থমকে যাওয়া বসন্তের রঙ ছিল সেটা।

হ্রদের দূর তীরে জঙ্গলটা নিঃশব্দে জ্বলছিলো। চোখের সামনে দাউ দাউ করে আগুনের শিখা ছড়িয়ে পড়ছিলো। বনের আগুন।
আগুন নেভানোর ট্রাকটা একটা খেলনা গাড়ীর মত হ্রদের পার ধরে দ্রুত ছুটে যাচ্ছিলো। জলের উপর তার খুব স্পষ্ট ছায়া পড়েছিলো। অসংখ্য মানুষ নীচ থেকে ঢাল বেয়ে পিলপিল করে উপরে উঠছিলো, পাহাড় কালো করে ফেলেছিলো ওরা।

নিজের কাছে এসে দেখি আমার চারপাশের বাতাস স্তব্ধ আর উজ্জ্বল। যেন বৃষ্টিহীন।
ঢালের নীচে শহরের ফালি – এক আগুনের সমুদ্র।
একটি মেয়ে ভিড় সরিয়ে ঢাল বেয়ে নেমে আসছিলো – একা। একমাত্র সে-ই পাহাড়টা বেয়ে নীচে যাচ্ছিলো।
বিস্ময়করভাবে, ওই পৃথিবী ছিলো শব্দহীন।
মেয়েটিকে যখন সোজা আগুনের সমুদ্রের দিকে হেঁটে যেতে দেখলাম, সহ্য করতে পারলাম না আমি।
একটাও শব্দ উচ্চারণ না করে, তখন মেয়েটির অনুভূতির সাথেই কথা বললাম। সত্যি, সত্যি।
“তুমি একা পাহাড় বেয়ে নেমে যাচ্ছ কেন? আগুনে মরবে নাকি?”
“মরতে চাই না, কিন্তু তোমার ঘর পশ্চিমে, তাই আমি পূবদিকে যাচ্ছি।”
মেয়েটির ছবি – আগুনের শিখার সামনে আমার স্বপ্ন ভরে দেওয়া একটা কালো দাগের মত। সেই ছবি চোখ চিরে দিল। ঘুম ভেঙ্গে গেল।
আমার চোখের কোণে জল।

মেয়েটি বলেছিলো সে আমার বাড়ির দিকে যেতে চায় না। আমি তা আগেই বুঝেছিলাম। ও যা কিছুই ভেবেছিলো, সবই তো ঠিক। জোর করে নিজেকে বোঝাতে গেলাম, উপর উপর মেনেও নিলাম যে আমার জন্য ওর সব অনুভূতিই মরে গেছে। তবু মেয়েটির হৃৎপিন্ডের কোথাও এক ফোঁটা হলেও যেন কিছুটা ভালোবাসা আছে – এমন ভাবতে ইচ্ছে করল। সত্যিকারের মেয়েটির সাথে এই আবেগের কোন যোগাযোগ যদিও নেই। নিজেকে বিদ্রূপ করতে করতে তবু গোপনে এই অনুভূতিকেই জীবন্ত করতে চাইলাম।
আচ্ছা, এই স্বপ্নের মানে কি এমন যে মনের একদম গভীরে আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম – আমার জন্য মেয়েটির কোন ভালোবাসাই আসলে নেই?

স্বপ্নটি ছিল আমার আবেগের একটি ছবি । আর স্বপ্নের ভিতর মেয়েটির আবেগগুলো ছিলো যা কিছু আমি ওর জন্য সৃষ্টি করেছিলাম – ঠিক তাই। সেগুলো আমার ছিলো। স্বপ্নে তো প্রতারণা করা যায় না, কোন ছলনা নেই।
অমন করে ভাবতে গিয়ে বড় বিধ্বস্ত আর একা লাগল নিজেকে।

(জে. মারটিন হলম্যান-এর ইংরেজী অনুবাদ থেকে)