নারীবাদী সমালোচনায় পৌরাণিক চরিত্ররা – রোখসানা চৌধুরী
Reading Time: 9 minutes

মিথ মানুষের নৃতাত্ত্বিক অভিজ্ঞানের অংশ। সংসদ অভিধান জানাচ্ছে, পুরাণ (ভারতীয়) হলো বৈদিক যুগের পরবর্তীকালে ইতিহাস বা জনশ্রুতি অবলম্বনে ব্যাসদেবের সংকলিত শাস্ত্রগ্রন্থ বিশেষ যার সর্গ, প্রতিসর্গ, বংশ, মন্বন্তর ও বংশানুচরিত- এই পাঁচটি লক্ষণ রয়েছে।

বলা হয়, মিথই সর্বপ্রথম এবং একমাত্র তন্ত্র, যার দ্বারা আদিম জনগোষ্ঠী জগতের ও মানুষের জীবনের স্বরূপ বুঝতে চেষ্টা করেছিল; যদিও সেই জীবনবোধে ঘটেছিল অতিলৌকিক কল্পনার মিশেল। পৌরাণিক কাহীনি মানুষের সভ্যতার বিবর্তনের কাল্পনিক ইতিহাস। আর কল্পবাস্তবের কুহকে ভরা সেই জগতেও আমরা প্রত্যক্ষ করি নর-নারীর (অথবা দেব-দেবীর) অবস্থানগত বৈষম্য। এসব কাহিনীতে নারীকে আমরা খুঁজে পাই কখনো দেবীরূপে, কখনো ক্ষমতাধর শাসকরূপে, এমনকি মায়াজাল বিস্তারকারিণী কুহকিনীরূপেও; যদিও এসব পরাক্রমের চিত্র ব্যবচ্ছেদ করে শেষ পর্যন্ত নারীকে ক্রীড়নক পুত্তলিকারূপেই খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ, পৃথিবীর ইতিহাস রচনা করেছে সমাজের বা রাষ্ট্রের ক্ষমতাবান পুরুষ। তাই ইতিহাসের আরেক সাম্রাজ্যবাদী নাম Ô History Õ তথা Ô His Story Õ তাই সেই ইতিহাসেও অবধারিতভাবে খুঁজে পাওয়া যায় নারীর অবদমিত নারীত্ব, উপহসিত ক্ষমতা। পৌরাণিক যুগে তার শরীরী সৌন্দর্য নিয়েই সমস্ত শিল্পিতা, অজন্তা-ইলোরা-কালিদাস। আজকেও নারী তার শরীরের মাপজোখ (Vital statistics )  তুলে দিচ্ছে পুরুষেরই হাতে, সদর্পে, বিশ্বসৌন্দর্য নিরীক্ষার নামকৃত বিকৃত ফাঁদে, অথবা আপাদমস্তক আবৃত করে তাকে অন্ধকারে বন্দী করা হচ্ছে পুরুষেরই হাত থেকে বাঁচার অজুহাতে।

শালপ্রাংশু পার্বতী

কালিকা পুরাণে পাওয়া যায় তারকাসুরের উৎপাতে ইন্দ্রাদি দেবতারা ব্রহ্মার শরণ নেন এবং জানতে পারেন মহাদেবের ছেলে কার্তিকের হাতে তারকাসুর মারা পড়বেন। দেবতারা  তখন পার্বতীর সঙ্গে মহাদেবের বিয়ে দেওয়া জন্য মদনকে পাঠিয়ে মহাদেবের তপস্যা ভঙ্গ করার চেষ্টা করেন। মহাদেব বিরক্ত হয়ে অন্যত্র চলে যান। পার্বতী শোকে-লজ্জায় অভিভূত হয়ে কঠোর তপস্যা শুরু করেন।

পুরাণ থেকে শুরু করে ধর্মগ্রন্থ বা সামাজিক অনুশাসন, সব ইতিহাসেই নারীর এ শালপ্রাংশু রূপটি প্রশংসাসূচকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যদি তার ব্যতিক্রম ঘটে তবে কী হয়? দেখা যাক।

রাগিণী, কুটিলা ও কালী- এঁরা তিনজনই মহাদেবকে বিয়ে করার জন্য তপস্যা করেছিলেন। দেবতারা লক্ষ রাখছিলেন কার সঙ্গে শিবের বিয়ে হতে পারে। একবার সুযোগমতো দেবতারা রাগিণীকে ব্রহ্মার কাছে নিয়ে যান;  ব্রহ্মা বলেন শিবের বীর্য এ ধারণ করতে পারবে না। রাগিণী এতে ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং ব্রহ্মা একে শাপ দিয়ে সন্ধারাগে পরিণত করে আকাশে রেখে দেন। কুটিলাকেও একই স্পর্ধা (!) দেখানোর কারণে নদীতে পরিণত হতে হয়।

মা মেনকা এভাবে দুটি মেয়ে হারিয়ে অত্যন্ত শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং পার্বতীকে তপস্যা বন্ধ করে ঘরে ফিরে যেতে বলেন। নারদ এসে জানান শিবের সঙ্গে পার্বতীর বিয়ে হবে। তাঁর কথায় পার্বতীর তপস্যা শুরু হয়। পুরুষের পদতলে আশ্রয় পাওয়ার জন্য আমরণ প্রচেষ্টা চলতে থাকে। গাছের একটি পর্ণও (পাতা) তিনি ভক্ষণ করেন না, এমন কঠোর অনশনের জন্য তাঁর নাম রাখা হয় অপর্ণা। দেবতারা তাঁর ধৈর্যের পরীক্ষা করছিলেন বা মহাদেবের যোগ্য হওয়ার পরীক্ষা নিচ্ছিলেন অথবা যোগ্য করিয়ে নিচ্ছিলেন।

বিয়ের ক্ষেত্রে এভাবেই পছন্দ-অপছন্দ, গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরুষের আধিপত্যই চিরকাল পরিলক্ষিত হয়।

পার্বতীর তপস্যার কয়েকটি পর্ব শেষ হয়ে যাওয়ার পরও মহাদেব পার্বতীকে পরীক্ষাগ্নিতে বিশুদ্ধ করে নিতে চান নিজেই। তাই ব্রাহ্মণ বেশে এসে শিবের নিন্দা করে পার্বতীকে বোঝাতে চেষ্টা করেন এই মহাদেব পার্বতীর স্বামী হওয়ার সর্বতোভাবে অনুপযুক্ত। যথারীতি প্রতিপ্রাণা পার্বতী ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। শিব শেষ পর্যন্ত স্বমূর্তি ধারণ করেন।

শিব-পাবর্তীর বিয়ে হয় চৈত্র শুক্লা তৃতীয়াতে। দুজন মিলে তারপর ত্রিভুবন পরিক্রমণ করে বেড়াতে থাকেন। তাদের এই সময়ের অচ্ছেদ্য বন্ধন থেকেই হর-গৌরী সম্পর্ক একটি চিরায়ত রূপ লাভ কর। কিন্তু এই কলোত্তীর্ণ প্রেমেও দূর হয়নি বর্ণবৈষম্যের (!) বোধ।

শিব পার্বতীকে একবার কালী বলে সম্বোধন করেন। অপমানিত হয়ে পার্বতী বনে চলে যান এবং পরিচারিকা পরিবেষ্টিত হয়ে আবারও তাঁর তপস্যা শুরু হয়। প্রতিবাদ নয়, প্রতিরোধ নয়, অপমানকে নারী প্রতিহত করতে চায় আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে। তপস্যা শেষে ব্রহ্মা দেখা দেন এবং তপস্যার কারণ শুনে বর দেন পার্বতীর গায়ের রং পদ্মের পাপড়ির মতো হবে, নাম হবে গৌরী। গায়ের চামড়া খুলে পড়ে যায়, রং হয়ে যায় গৌরবর্ণ। দেবতাদত্ত যোগ্যতায় ভূষিত হয়ে গর্বিত হয় নিজ খর্বতায় অসচেতন নারী। যুগ যুগ ধরে সেই অলংকারের অর্থহীন বোঝাই বয়ে আসছে নারী। কী কাব্যে, কী শরীরে।

দ্রোপদীর দোলাচলতা

রূপকথার পরমাসুন্দরী রাজকন্যাকে কে না চেনে, যার সোনার পালঙ্কের শিয়রে রূপার কাঠি আর পায়ের কাছে সোনার কাঠি অপরূপা রূপসীকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে, কখনো অশুভ শক্তির প্রভাবে রাজকন্যা বরফ হয়ে যায়, কখনো পাথর। তার রূপের বর্ণনায় কথাকার কখনো কার্পণ্য করেন না। উচ্ছ্বাসের কোনো ঘাটতি পড়ে না তার লেখায়। রাজপুত্র তাকে দেখে মুগ্ধ হয়, অনেক বাধা-বিপত্তি, চড়াই-উতরাই পার হয়ে অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যাকে লাভ করে দেশে ফিরে যায়। আর রাজকন্যার একমাত্র দায়িত্ব হলো সীমাহীন সৌন্দর্যের অধিকারী হওয়া।

মহাভারতের দ্রৌপদী রূপকথার নায়িকা নন। প্রেমে-ঈর্ষায়-প্রতিশোধপরায়ণতায় ব্যঞ্জনাময় ব্যতিক্রমী এক নারী।

কে তুমি সুন্দরী, যার বিন্দু বিন্দু অশ্রু ঝরে ভেসে যায়

পদ্ম হয়ে নদীর সচ্ছল স্রোতে অবিরল?

কোন পূত নিলীমায় লিপ্ত তুমি?

কোন পুণ্যজল তোমার লাবণ্যসার আপনার তরঙ্গে মেশায়?  (রোদন রূপসী/মরচে পড়া পেরেকের গান)

দ্রৌপদীর বিয়ের ঘটনাটি মহাভারতের একটি উল্লেখযোগ্য অসাধারণ ঘটনা। পঞ্চস্বামীর স্ত্রী হওয়া এ যুগেও সম্ভব কিনা, তা ভাববার বিষয়। দ্রৌপদী কি স্বেচ্ছায় এই বিয়ে মেনে নিয়েছিল? পৌরাণিক ইতিহাসে দেখা যাচ্ছে দ্রৌপদীর এই অদ্ভুত অবস্থা জন্মের আগেই নির্দিষ্ট ছিল। আসলে নারীর ভাগ্য শতজন্মেও দেবতার তথা পুরুষের করতলগত থেকেই যায়।

তাই পূর্বজন্মে যখন তিনি একজন স্বামীর অনুগ্রহ (!) পাচ্ছিলেন না তখন মহাদেবকে পূজা করতে গিয়ে পাঁচবার পতিং- দেহি বলার পর তিনি প্রতিবারই বর পান।

দ্রৌপদীর বিয়ের জন্য স্বয়ংবর সভার আয়োজন করা হয়। বলা হয় এই রীতি পৌরাণিক যুগের নারী স্বাধীনতার দৃষ্টান্ত। কিন্তু দ্রৌপদীর সিদ্ধান্তই কি শেষ সিদ্ধান্ত ছিল?

প্রথমত, জন্মের সময়ই দ্রৌপদীর পিতা অর্জুনের সঙ্গে তার বিবাহ দেওয়ার ইচ্ছায় নির্ধারণ করে দেন, দ্রুপদ নির্মিত দুর্জয় ধনুতে জ্যা লাগিয়ে যন্ত্রের মধ্য দিয়ে পঞ্চবাণে সে লক্ষ্যভেদ করবে সে-ই দ্রৌপদীকে বিয়ে করবে।

দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণবেশী অর্জুন লক্ষ্যভেদ করলে ব্রাহ্মণকে কন্যাদান করার জন্য সমবেত রাজারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তারা ঠিক করেন দ্রুপদকে সবংশে শেষ করবেন। কাহিনীর কূটভাষ এই যে তারা বিজয়ী ব্রাহ্মণকে ক্ষমা করে দিতে চান। অথচ দ্রৌপদী কোন রাজাকে বরণ করে না নিলে তাঁকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তৃতীয়ত, যুদ্ধে পান্ডবরা জয়ী হয়ে বাড়ি ফিরলে ভীম মা কুন্তীকে উদ্দেশ করে বাইরে থেকেই  কৌতুক করে বলেন, মা তোমার জন্য ভিক্ষা করে এনেছি। ভেতর থেকে পূজারত মা বলে বসেন, পাঁচ ভাই সমান ভাগে ভাগ করে নিও। বাইরে এসে দ্রৌপদীকে দেখে বিমূঢ় হয়ে পড়েন। তখন বলেন, তিনি না জেনেই এ কথা বলেছেন, তবু এ কথা যেন অরক্ষিত না হয় আবার দ্রুপদ কন্যারও অমর্যাদা না হয় সেই ব্যবস্থা করতে বলেন। বিয়ে করতে কেউ রাজি না হলেও পাঁচজনই কিন্তু রিপুজনিত তাড়না অনুভব করেন। তাদের মনের এ চাঞ্চল্য লক্ষ্য করে যুধিষ্ঠির বলেন, সবাই একে বিয়ে করবে।

দ্রৌপদীর পিতা সহজাত কারণেই কন্যার এ অবস্থাদৃষ্টে বিব্রত ও বিমূঢ় হয়ে পড়েন। কিন্তু ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির কুন্তীর নির্দেশের কথা জানান এবং জটিলা নামে এক গৌতমীর উদাহরণ দেন, যিনি একসঙ্গে সাত ঋষির ঘর করেছিলেন। এরপর যুধিষ্ঠির থেকে শুরু করে ক্রমে পাঁচ ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।

এই বিবাহে দ্রৌপদীর মত এবং অমত কতটুকু ছিল, তা পাঠকের অগোচরেই থেকে যায়।

বিয়ের পর কুন্তী নববধুকে আশীর্বাদ করে বলেন, ‘যথেন্দ্রানী মহেন্দ্রস্য স্বাহা চৈব বিভাবসৌ….। আজও নববধুকে এ মন্ত্রেই আশীর্বাদ করা হয়। এ অদ্ভুত বিয়েতে দ্বারকা থেকে কৃষ্ণ বহু উপহার পাঠন।

অতঃপর পঞ্চস্বামী নিয়ে দ্রৌপদীর সহাবস্থান যেন জটিল না হয়ে ওঠে সে জন্য নারদ ব্যবস্থা করে  দেন ক্রমান্বয়ে তিনি এক বছর করে এক এক ভাইয়ের সঙ্গে থাকবেন। সেই সময় অন্য কোনো ভাই এলে তাকে বারো বছর বনে বাস করতে হবে।

দ্রৌপদী একবার যখন যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে ছিলেন তখন অর্জুন সেখানে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। নিয়মানুসারে অর্জুন তখন তীর্থযাত্রায় বের হয়ে যান। এ সময় অর্জুন সুভদ্রাকে বিয়ে করেন। এ বিয়ের জন্য দ্রৌপদীর বেশ অভিমান বা ঈর্ষা হয়েছিল। নারীর একাধিক বিয়ে দেবতানির্ধারিত হলেও পুরুষের বিয়ে, পুরুষের সঙ্গী নির্বাচন- সবই তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। পুরুষ যখন একাধিক বিয়ে করে তখন প্রত্যেক স্ত্রীকেই তার অংশবিশেষ বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু একজন নারীর ক্ষেত্রে কি একই বিবেচনা কার্যকর হয়?

একাধিক স্ত্রী যদি অংশবিশেষ হয় তাহলে অনেক পুরুষের হাতে একজন নারী ক্রীড়নক পুতুলমাত্র বা তার চেয়ে খানিকটা অধিক মূল্যবান সম্পত্তি,  যাকে অনায়াসে বাজি রেখে জুয়া খেলা যায়। যুধিষ্ঠির তাই দ্রৌপদীকে বাজি রেখে পাশা খেলেন এবং দুঃশাসনের  কাছে হেরে যান। দুঃশাসন রাজসভার মধ্যেই দ্রৌপদীর শাড়ি খুলে ফেলে তাকে অপমান করার চেষ্টা করে। দেবতার সহায়তায় দ্রৌপদীর শাড়ি অন্তহীন হয়ে তাকে রক্ষা করেছিল।

আকাশ ভরে উঠল সোর

মেঘের ঘোর জলের তোড়

মন্ত্রপড়া অন্তরাল

দিলো না তবু সাড়া

অসম্ভব দ্রৌপদীর অন্তহীন শাড়ি।

(দ্রৌপদীর শাড়ি/বুদ্ধদেব বসু)

অথচ মুক্তি পেয়েই দ্রৌপদী ধৃতরাষ্ট্রের কাছে পাশা খেলায় হেরে বন্দি হয়ে থাকা সমস্ত পান্ডবের মুক্তি চেয়ে নেন।

বাঙালি নারীর ‘সর্বংসহা ধারিত্রী’ কিংবা দশভূজা দুর্গার রূপের জয়গাঁথা রচনার তখন থেকেই হয়তো শুরু।

দ্রৌপদীর এই অসম বিয়েতে হৃদয় দৌর্বল্যও কি অসমভাবেই ঘটেছিল? শোনা যায়, দ্রৌপদীর প্রতি সত্যিকার মনোযোগ ছিল ভীমের, সেই মনোযোগ সহজাত কর্তব্যবোধ আর ভালোবাসার সহযোগ ছিল।

তাই স্বয়ংবর সভায় রাজাদের সঙ্গে পান্ডবদের দ্বন্দ্ব বেধে উঠলে ভীম সর্বাগ্রে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং একটি গাছ উপড়ে নেন। ধৃতরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ সমস্যার মীমাংসা হলে দ্রৌপদী প্রতিজ্ঞা করেন দুঃশাসনের রক্তমাখা হাতে ভীম যেদিন তাঁর চুল বেঁধে দেবেন সেদিন থেকে তিনি আবার চুল বাঁধবেন। কাপুরুষ পান্ডবদের ভেতর ভীম একাই সেদিন দ্রৌপদীর হয়ে প্রতিপক্ষ নির্মাণ করেছিলেন।

আরেকবার বিরাটের স্ত্রী সুদেষ্ণার ভাই কীচক দ্রৌপদীকে দেখে লুব্ধ হয়ে পড়ে। কোনোভাবেই তাকে আয়ত্ত করতে না পেরে প্রকাশ্য সভায় দ্রৌপদীকে অপমান করে সে। এবারও পান্ডবেরা বিরাটের ভয়ে নীরব থাকলে দ্রৌপদী যুধিষ্ঠিরকে কটূক্তি করেন। এটা তার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, যা পৌরাণিক যুগে বিরল ঘটনা।

তারপর তিনি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ভীমের কাছে এসে কীচককে হত্যা করতে বলেন। ভীম সত্যিকার প্রেমিকের মতোই আশ্বাস দেন এবং কৌশলে নাট্যশালায় আমন্ত্রণ জানিয়ে তাকে পিষে মাংষপিন্ডে পরিণত করে ফেলেন।

দ্রৌপদীর প্রতিহিংসা তারপরও যেন শেষ হয় না। উপকীচকদের যেচে গিয়ে ডেকে দেখান প্রতিশোধের চেহারা। এ সময় আবারও তিনি আক্রান্ত হন এবং ভীম এসে তাকে মুক্ত করেন।

ভীমের প্রণয়াবেগ বারংবার প্রকাশিত হয় তার কাজে, কিন্তু মৌখিকভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি ছিলেন নীরব।

কামনার সান্দ্র আবেদনে

জ্বলেছি সম্মত ধূপ হাজার শয্যায় মনে মনে

দ্রৌপদীকে দুর্বল জেনেও।

(যে আঁধার আলোর অধিক/ বুদ্ধদেব বসু)

মহাভারতেই জানা যায়, দ্রৌপদীর প্রকৃত পক্ষপাতিত্ব ছিল অর্জুনের প্রতি। তবু প্রয়োজন সিদ্ধিরর জন্য তিনি ভীমকেই অনুরোধ করতেন বারবার। তার প্রতি ভীমের নিজস্ব আবেগ হয়তো অনুভব করতেন দ্রৌপদী। এভাবেই দ্রৌপদীর বিয়ে আর বিবাহোত্তর প্রণয় রূপকথার মতো সরল থাকেনি আর। দ্রৌপদী তাই আধুনিক পাঠকের কাছে পৌরাণিক দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না হয়ে রক্ত-মাংসের চিরচেনা মানবীরূপে প্রতিভাত হন।

দ্রোহে-শক্তিতে শকুন্তলা

পৌরাণিক কাহিনীতে অসংখ্য নারীচরিত্রের দেখা মেলে। বিচিত্র তাদের রূপ ও অবয়ব। এখানে আছে দ্রৌপদীর মতো প্রতিশোধপরায়ণ নারী, আছে প্রমীলার মতো যোদ্ধা নারী, শকুন্তলার মতো স্বয়ংবরা তেজী দুঃসাহসী নারী। অথচ বাঙালি নারী তাদের আদর্শ হিসেবে কেন যে সীতা-সাবিত্রীকেই জীবনভর পূজা করে আসছে তা বোঝা দুস্কর।

প্রথিতযশা ঔপন্যাসিক বিমল কর তার ‘অসময়’ উপন্যাসে কোনো এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন- সীতা সীতা করে এদেশের মেয়েরা পাগল। নারীত্বের যা কিছু মহিমা সব যে সীতায় সার্থক। একসময় আমি ঠাট্টা করে বন্ধুদের বলতাম, তোমাদের মহাকবির বংশধররা খুব বিচক্ষণ লোক; বেচারা রামকে যতই ভোগাক সীতাকে একেবারে জড়োয়া সেট করে ফেলেছে হে। যত রকম দামি পাথর পেয়েছে সব ঠেসে দিয়েছে ঐ সেটে। আমার দেশের মেয়েরা বরাবরই অলঙ্কারলোভী; তারা ঐ অলঙ্কারটাই বেছে নিয়েছে। (পৃ.৩৫/অসময়)

যাই হোক, বর্তমান সময়কে পাশ কাটিয়ে আমরা কিছুক্ষনের জন্য প্রয়াণ করিব দূর-অতীতে, মালিনী-দাসস্য কালে। বিষয় শকুন্তলা-দুষ্মন্তের প্রেম-বিরহ-কামনা-সন্তাপ এবং ওই কাহিনীর মূলে পুরাণবর্ণিত দেবতা ও মানুষের সংঘাত।

বিশ্বামিত্রের ঔরসে মেনকার গর্ভে শকুন্তলার জন্ম। কন্যা জন্মালে বিশ্বামিত্রের চৈতন্য হয়; তিনি ফিরে যান। শকুন্তলার অভিশপ্ত (!) নারীজন্মের তখনই শুরু। মালিনী তীরে মা মেনকাও সদ্যোজাত মেয়েকে ফেলে দিয়ে চলে যান। একটি শকুন সূর্যের প্রখর তাপ-রোদ থেকে তখন শিশুটিকে রক্ষা করে। এরপর সৌভাগ্যক্রমে কণ¦ মুনি শিশুটিকে দেখতে পান এবং তুলে নিয়ে গিয়ে লালন-পালন করেন। শকুন্তলা এ আশ্রমেই বেড়ে ওঠে।

ইত্যবসরে রাজা দুষ্মন্ত শিকারে এসে কণ¦ মুনির আশ্রমে অতিথি হন। তিনি অনুপস্থিত থাকায় শকুন্তলা অতিথি সৎকার করেন। মানব-মানবীর চিরন্তন প্রণয় স্বতঃস্ফুর্তভাবে প্রকাশের  অবকাশ মেলে। তবে শকুন্তলার জন্য এটা প্রথম প্রণয় হলেও সসাগরা অধিপতি দুস্মন্তের জন্য এটা ছিল বপ্রক্রীড়া মাত্র। বঙ্কিমের ভাষায়- ‘এখানে, তপোবনে-তপস্বীকন্যা, রাজপ্রাসাদের অনুচিত অভিলাষিণী- এখানে শকুন্তলা কে? করিশুন্ডে পদ্ম মাত্র।’

(শকুন্তলা, মিরন্দা এবং দেসদিমোনা/বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

ছিল বীর্য, ছিল ভার্যা, ছিল বেশুমার

ভোগের বেদিতে ছিল তুমুল রসদ

ধর্ম রাজ্যে আইনের সীমা সরহদ-

পুরষের মন ভোলানো প্রণয় সংলাপে যথারীতি রাজা দুষ্মন্তেরও ছিল অসীম পারদর্শিতা। কুমারী শকুন্তলার হৃদয় জয়ে রাজাধিরাজের প্রচেষ্টার কমতি ঘটেনি।

অন্তরে, অন্দরে আর মুনির কুটিরে

ফোটে যে রজনীগন্ধা, পূজা-উপচার

সেই ফুলে অধিকার কোন দেবতার?

এ ফুল রাখব আমি যমুনার তীরে।

এরপর গান্ধর্বমতে তাদের বিয়ে হয়। দেবতা বায়ুই ছিল এই বিয়ের একমাত্র সাক্ষী ও উপকরণ।

কণ¦মুনি ফিরে এসে সব জানতে পেরে আর্শীবাদ করেন এবং তোমার ছেলে সাগরপাঙ্গাং মেদিনী ভোগ করবে। শকুন্তলা বর চান দুষ্মন্তের জন্য। দুষ্মন্ত বর পান ধর্মিষ্ঠ ও রাজ্য স্খলিত হওয়ার। আশীর্বাদ কেবলই পিতা-পুত্রের নিমিত্তে, নারী সর্বংসহা ধরিত্রী (!) দুস্মন্ত ফিরে আসার সময় শকুন্তলাকে অভিজ্ঞান হিসেবে শকুন্তলাকে নিজের আংটি দিয়ে গিয়েছিলেন এবং বলে গিয়েছিলেন শিগগিরই তাকে লোক পাঠিয়ে প্রাসাদে নিয়ে আসবেন।

আশ্রমে এর মাঝে একদিন ঋষি দুর্বাসার আবির্ভাব ঘটে। দুর্ভাগ্যতাড়িত শকুন্তলা তখন সন্তানসম্ভবা, একমনে বসে স্বামী দুষ্মন্তের ধ্যান করছিলেন। সে জন্য তিনি দূর্বাসার জলদগম্ভীর আয়োমহন্তোঃ ডাকও শুনতে পান না। কি এমন ভাবছিলেন তিনি যে জন্য আশ্রমপালিতা হয়ে ঋষির ডাক শুনতে অক্ষম হন?

আত্মজ্ঞানশূন্য তার হৃদয় সংরাগ

এ নারী অস্তিত্ব জুড়ে শুধু পতিময়

তবু ভয়, সপতœীরা অন্তঃপুরময়

বেদখল করে বুঝি পতির পরাগ

শকুন্তলার হৃদয়ে প্রেম তো ছিলই, কিন্তু তার সঙ্গে ছিল অবিশ্বাস আর সন্দেহ। কারণ তত দিনে শকুন্তলা হয়তো তাঁর সপতœীভাগ্য সম্পর্কে অবহিত হয়ে গেছেন। প্রচন্ড রেগে গিয়ে দুর্বাসা অভিশাপ দেয়, যার কথা শকুন্তলা ভাবছে সে যথাসময়ে শকুন্তলাকে চিনতে পারবে না। শকুন্তলার দুই সখী প্রিয়ংবদা ও অনুসূয়া, এই শাপ দেওয়া শুনে ঋষিকে শান্ত করে বর আদায় করেন যে শকুন্তলা কোনো অভিজ্ঞান দেখাতে পারলে রাজা আবার চিনতে পারবেন।

রাজা লোক পাঠাচ্ছে না দেখে ঋষি কণ¦ গৌতমী ও শার্ঙ্গরব দুজনকে সঙ্গে দিয়ে শকুন্তলাকে রাজধানীতে পাঠিয়ে দেন। পথে সোমভারতীর্থ নামের নদীতে ¯স্নান করার সময় রাজার দেওয়া আংটিটি জলে পড়ে যায়। কেউ টের পায় না। রাজধানীতে এলে দুর্বাসার অভিশাপে রাজা শকুন্তলাকে চিনতে পারেন না। এই আকস্মিক আঘাতে কী প্রতিক্রিয়া ছিল শকুন্তলার?

আসলে শকুন্তলা আমাদের খুব পরিচিত সেই মেয়ে, যে সমাজবহির্ভূত প্রেমে জড়ায়, সাক্ষীবিহীন বিয়ে করে, প্রতারিত হয়; কিন্তু ভেঙে পড়ে না, আত্মহত্যা করে না অথবা ডেসডিমোনার মতো স্বামীর আদেশ শিরোধার্য ভেবে অবনত হয় না। শকুন্তলা ক্ষুদ্ধ হয়, হঠাৎ অপরিচিত হয়ে ওঠা প্রেমিকের চাপিয়ে দেওয়া অপবাদের প্রতিবাদ করে।

দেবতাদের চক্রান্তে শকুন্তলার এই বিচ্ছেদ বিরহ, যেন রাজশক্তির অন্ধ আক্রোশের কাছে শ্রমজীবী মানুষের লাঞ্ছনা। যেন একজন সাধারণ নিপীড়িত প্রজা রাজাকে ব্যঙ্গ করছে, অভিশাপ দিচেছ।

একচ্ছত্র জয় নেই, নেই কোন জয়ী

বিজয়ী বিজিত কভু, বিজিত বিজয়ী

যখন রাজা শকুন্তলাকে অশিক্ষা সত্ত্বেও চাতুর্যপটু বলে উপহাস করেন তখন ক্রোধে, দম্ভে দুঃখ-লজ্জা ত্যাগ করে শকুন্তলা বলে ওঠে, অনার্য, আপনার ভাবে সকলকে দেখো?

রক্ষণশীল সামন্ত শ্রেণীর মুখপাত্র বঙ্কিম অবশ্য সময়ের প্রেক্ষিতে শকুন্তলার এই বিদ্রোহ মেনে নিতে পারেননি। তাঁর মতে, ‘যদি স্বামীর প্রতি অবিচলিত ভক্তি অবিচলিত তাহাই যদি সতীত্ব হয় তবে শকুন্তলা অপেক্ষা ডেসডিমোনা গরিয়সী। স্বামীকর্তৃক পরিত্যক্তা  হইলে শকুন্তলা দলিত-ফণা সর্পের ন্যায় মস্তক উন্নত করিয়া ভর্ৎসনা করিয়াছিলেন।’

যে ঔদ্ধত্যের কারণে বঙ্কিম শকুন্তলার চাইতে মিরান্ডা  (টেম্পেষ্ট) আর ডেসডিমোনাকে (ওথেলো) সরল ও শ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করেছেন, সেই ঔদ্ধত্যকে আমরা বলছি আধুনিক নারীর স্বাতন্ত্র্য ও সচেতনতাবোধ।

শকুন্তলাকে তাঁর সঙ্গীরা প্রাসাদে ফেলে রেখে যেতে ইচ্ছুক ছিল, কারণ স্বামীর ঘরই  স্ত্রীর আসল ঠিকানা- এ জাতীয় বিশ্বাস তাদের পূর্ণমাত্রাতেই ছিল।

কিন্তু শকুন্তলা নিজ সতীত্ব পরীক্ষার লক্ষ্যে দাসী মহলে সহাবস্থানে স্বীকৃতি জ্ঞাপন না করাতে তার সত্যিকার পদমর্যাদাবোধ পরিলক্ষিত হয়। কথিত আছে, এ সময় মা মেনকা নিজ কন্যাকে কশ্যপ মুনির পর্বতে পৌঁছে দিয়ে অপমানের হাত থেকে রক্ষা করেন।

নিয়তি আর দুর্ভাগ্য চিরকাল নারীকেই তাড়া করে ফেরে কিন্তু এখানে দুস্মন্ত তার বাইরে রইলেন না। তিনি শতপত্নীর অধিকারী হয়েও থেকে গেলেন অপুত্রক। নিঃসন্তান হওয়া কত দুঃখের- তাঁর এই দীর্ঘশ্বাস, তা ছাড়া সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়েই হয়তো তাকে কাকতালীয়ভাবে পৌঁছে দেয় কশ্যপ আশ্রমে।

তার আগেই মাছের পেট থেকে আংটি ফিরে পেয়ে রাজা স্মৃতিপ্রাপ্ত হয়েছেন। বিরহী দুষ্মন্ত দেবাসুরের সংগ্রাম থেকে ফেরার পথে কশ্যপ মুনির আশ্রমে আতিথ্য গ্রহণ করেন।

এখানে এক অচেনা বালককে দেখেন সিংহকে চেপে ধরে সিংহের দাঁত গুনছে। দুষ্মন্তের পুত্রশোক জেগে ওঠে, কারণ ইতিমধ্যেই তিনি শকুন্তলার পুত্রলাভের খবর পেয়েছিলেন। এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়, পুত্রমোহ সৃষ্টি না হলে আদৌ তিনি শকুন্তলার মনোযোগ পুনরুদ্ধারে ব্যস্ত হতেন কি না।

যাই হোক, পৃথিবীপতি দুষ্মন্ত তাঁর সর্বাশ্রয়ী ব্যক্তিত্ব ভূলুন্ঠিত করে ক্ষমা চান শকুন্তলার কাছে। বিজয়ী শকুন্তলা শেষ পর্যন্তও কি সম্পূর্ণ নমনীয়? প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আসল কারণ জানতে পেরে শকুন্তলার উক্তি- ‘ভাগ্যে এই কথা জানলাম, নতুবা সারা জীবন আমার অন্তঃকরণে আর্য্যপুত্র অকারণে পরিত্যাগ করেছেন বলে ক্ষোভ থাকতো।’

সংক্ষুদ্ধ চেতনার আলোকে নতুনভাবে প্রাণ পেয়ে বিপর্যস্ত শকুন্তলার আবার দাঁড়িয়ে ওঠা, আমাদের আজকের নারী জাগরণের এই বিভ্রান্তিকর সময়ে এক ধরনের আলোকিত শক্তির সন্ধান দেয়। শকুন্তলার বিদ্রোহ আর একাকিত্ব, তাঁর স্বেচ্ছাবিবাহ ও একক মাতৃত্ব সব ঘটনাই পরস্পর সাযুজ্যপূর্ণ এবং সাহসিক ব্যঞ্জনায় সমুজ্জ্বল।