ডাক্তারবাড়ি – শীলা বৃষ্টি
Reading Time: 9 minutes

টেলিফোনে পাওয়া সংবাদটি হতচকিত হওয়ার মতো না হলেও দুঃখ পাওয়ার মতো, কেননা যে নামটি খবরটির সাথে জুড়ে ছিল সেটির সাথে একাত্ম হয়ে আছে বহু দূর ফেলে আসা আমার ছেলেবেলার বহু দিনের বহু কথা। আর তাই ফোনে বাবা যখন বললেন, “গজেন্দ্রবাবু আজ সকালে মারা গেছেন।” তখন নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল আমার। বাবা বলে যাচ্ছেন,”ভাইবছিলাম আইজ ঢাকা যাওয়ার কথা, লাশ দেইখতে গেরামে না যাই আর। কী ভুলটাই না হইতো যদি না আইসতাম! ওম্মা! পুরা তিন গেরাম ভাঙ্গি ফইরসে বিষ্ণুপুর হাই ইস্কুলের মাঠে।” বাবা বলেই যাচ্ছেন একটানা, কিছু আমার কানে ঢুকছে আর কিছু আষাঢ়ের ঝড়ো বাতাসে দোল খাচ্ছে। চোখের সামনে শাদা-কালো দিনের সিনেমার মতো ভেসে উঠছে গজেন্দ্রবাবু-পরিবারকেন্দ্রিক নানান স্মৃতি।

ভদ্রলোক আমাদের গাঁয়ের প্রসিদ্ধ ডাক্তার বলরাম বাবুর ছোট ছেলে। ফেনী এলে মাঝে-মাঝে আমাদের বাসায় আসতেন বাবা আছেন জানলে। এসেই আমাদের বানান ধরা শুরু করতেন। মনে আছে সেই প্রথম বারের কথা, আমরা তখন সবে ফেনী এসেছি স্থায়ীভাবে। নরসিংদী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কিংবা আগ্রাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিশাল গণ্ডি ছেড়ে বছরের মাঝে বলে ভর্তি হতে হয়েছে ফেনী মডেল হাইস্কুলের ক্ষুদ্র আঙিনায়। আঙিনা ক্ষুদ্র হলেও কম্বাইন্ড স্কুলের অবারিত বন্ধুতায় যে আনন্দ পেয়েছিলাম আমার স্কুল জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল সেটি। ওখানে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হলে পরের বছর সবাইকে তাক লাগিয়ে আমার রোল নম্বর হয় ২। এর আগে সরকারি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে কখনও ২৫, কখনো ১৪, কখনো ২৮ রোল হওয়া মেয়ের সেকেন্ড হওয়াটা আমার বাবার কাছে ছিল ব্যাপক আশ্চর্যের বিষয়। রোল ২ হওয়ার নেপথ্যের কারণ আর কিছুই না, মডেল হাই-এর ফেনী শহরের ডেট মার্কা স্কুল হিশেবে বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল তখন। আমার রোল দুই নয়, এক-ই হতো, যদি না রাজীব চক্রবর্তী নামের প্রথম হওয়া ছেলেটি আদতেই মেধাবী না হতো। মেয়ে ক্লাস এইটে সেকেন্ড হয়েছে, বাবা সেই অভাবনীয় সাফল্যের সংবাদই শোনাচ্ছিলেন বেড়াতে আসা গজেন্দ্র কাকাকে। আমি সামনেই ছিলাম; কাকা চায়ে বিস্কুট চোবাতে-চোবাতে জিজ্ঞেস করলেন আমায়, “সেগেন্ড(সেকেন্ডের আঞ্চলিক উচ্চারণ) বানানি করো।” আমি চটপটিয়ে বলে যাচ্ছি, “s-e-g-e-n-d” উচ্চারণে যেহেতু জি এবং ই আছে আমি ধরেই নিয়েছিলাম বানান এমনই হবে। সেগেন্ড বানানে যে জি এবং ই থাকে না সেটি টের পেলাম বাবার মুখ দেখে, কে যেন হুট করে এক দোয়াত কালি উলটে দিয়েছে বাবার সেই ফর্শা মুখে!

সেই শুরু! এরপর থেকে কাকা এলেই আমাদের বানান ধরতেন, ভুল বানান শুধরে দিতেন। কাউকে আঘাত করার জন্য নয়; কাকা সম্ভবত বানান থেকে ভুলগুলো বের করার মধ্য দিয়ে গোটা পৃথিবীটাকেই শুদ্ধ করতে চাইতেন। পেশায় শিক্ষক ছিলেন কাকা, পরনের ধুতির মতোই মসৃণ ছিল তাঁর হস্তাক্ষর। কোনও বিষয়ের মূল না জেনে সেটি নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করতেন না। তাঁর এই শুদ্ধাচারী মনোভাবের সাথে জাগতিক মিলের অভাব ছিল বলে নিজ গণ্ডিতেই বন্দি থাকতেন বেশি। প্রথম দিকে তাঁকে দেখলে আমরা ভাইবোনেরা পালাই-পালাই করলেও একসময় আমাদের প্রিয় মানুষ হয়ে গেলেন কাকা। শুদ্ধ বানানের সাথে তাঁর ভাণ্ডারে গল্পের বিশাল এক ঝোলাও যে থাকত!

সেই কাকা মারা গেলেন। আমার আকাশের একটি নক্ষত্রের পতন হলো যেন! এই পরিবার কত প্রাচীন কালের ঐতিহ্য ধারণ করে ছিল! কাকার বাবা বলরাম বাবু পেশায় ডাক্তার ছিলেন। কী আভিজাত্য ছিল সেই ডাক্তারবাড়ির! অথচ কোনও অহংকার নেই। বাবা বলতেন, “স্বাধীনের আগে তো দেখোস নাই! কী প্রতাপ আছিল হেতারগো!”

গ্রামে মিলিটারি ক্যাম্প করলে একদল আসে ডাক্তারবাড়িতে। বলরাম ডাক্তার যাঁর আঞ্চলিক নাম বল্লম ডাক্তার, তাঁর ভাইয়ের ১২ বছর বয়েসি ছেলেটিকে পুকুরে নামিয়ে বলেছিল, “তুম বাঙাল কো তো আচ্ছেসে তেহেরনা আতা হ্যায়। আব তেহরো! তেহেরকারকে মাছলি পাকরো।” পিচ্চি ছেলে, সাঁতরে মাছ ধরবে কী! ছেলেটি হাঁচরেপাঁচরে ঐ পাড়ে উঠতে যায়, কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকদল তাকে উঠতে না দিয়ে বলে, “আভি নেহি, পেহেলে মাছলি পাকরো।” ছেলেটি আবার এ-পাড়ে আসে, এই পাড়ের অবস্থাও তথৈবচ। শিশুটি হয়তো এপার-ওপার করেই পরপারে চলে যেত যদি না ডাক্তারের বাবা দলপতিকে বলতেন, ” তুমলোক ইয়ে তালাবকি সারি মাছলি লে যাও, বদলেমে মেরা পোতাকো ছোড় দো।” পাকবাহিনীর সেই দলের মন সেদিন দয়ায় সাগর হয়ে ছিল নির্ঘাত; নতুবা আসন্ন মৎস ভোজনের পূর্বে কারও সলিলসমাধি রচনায় আর আগ্রহ পায়নি তারা। শতশত মাছের বিনিময়ে শিশুটির প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল সেদিন। আমাদের গ্রামের পরের ইতিহাসে যা শুনেছি, তাতে গৃহস্থের সমস্ত সম্পদের বিনিময়েও কারও কারও প্রাণ রক্ষা করা যায়নি আর। যাই হোক, লেপে-পুছেও যতটুকু আড়ম্বর ডাক্তার পরিবারের ছিল, তাতেও আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে যেত। সেই জাঁকজমকের দ্যুতি তাদের সহায় সম্পত্তির চেয়ে তাদের জ্ঞান আর কর্মদক্ষতাতেই প্রকট হতো বেশি। আমরা যখন কিশোর-কিশোরী তখন বলরাম ডাক্তার জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। বলরাম ডাক্তার, যার গ্রাম্য উচ্চারণ ছিল বল্লম ডাক্তার, তাঁকে ঘিরে বহু গল্পকথা তাদের ঝাঁপি খুলত, যেগুলোর প্রায় সমস্তই ডাক্তারের ডাক্তারি তেলেসমাতি উপচে উঠত। কোন মরাকে কোনদিন তিনি বুকের উপর এক থাবড়া দিয়ে খাড়া করে ফেলেছেন কিংবা কোন শিশুর পেট কাটা ছাড়াই আঁতল কুইচ্যা বের করে ফেলেছেন। কোন মৃতপ্রায় প্রসূতির সন্তানগুলো, যারা কিনা দাইয়ের হাতে তাদের চিরপরিচিত পথ দিয়ে বের হতে গিয়ে মায়ের সাথে নিজেরাও মরতে বসেছিল, ডাক্তার নাকি পেট কেটে তাদেরকে তাদের মাসহ উদ্ধার করেছেন। “কী আচাইরয কারবার! ফেডে সিলি, আবার বাইচ্চাও ক্যাঁওম্যাঁও করে কাঁইনতে কাঁইনতে মায়ের দুদ চো-য়! কেউ কনো সময় দেইখসেনি এইচ্যা বেমইক্যা কারবার! ফেট কাইটলে মানষ বাঁচে ক্যান্নে! আর হেতিরা বলে টেরও হাও নো কিসু।”

এইসব বহু আগের কথা, আমাদের জন্মও হয়নি তখন; কিন্তু ইতিহাসের রেশ হিশেবে তখনও বেশ জাগ্রত এসব। থাকবেই না কেন, বল্লম ডাক্তারের শরীর বয়েসের আক্রমণে ক্ষয় হতে থাকলেও, হাতযশ রেখে দিয়েছিলেন একেবারে অক্ষত। আর চিকিৎসার বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়ার কথাও তেমন শোনা যায়নি।

আমার বেশ মনে আছে; যতদিন ডাক্তারকে দেখিনি, শুধু গল্প শুনে গেছি তাঁর, আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত একজন হ্যাংলা-পাতলা বৃদ্ধ মানুষ। ফর্শা নিরাভরণ শরীর, একটা ঘিয়ে রঙের পৈতা আড়াআড়িভাবে পিঠ আর বুককে অলংকৃত করছে সগৌরবে। নিম্নদেশে প্যাঁচানো মাড়হীন ধুতি যেন পরিচ্ছদের আনুষ্ঠানিকতাকেই বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। হাতে তার ইয়া লম্বা একটি বল্লম। তাঁকে নিয়ে প্রচুর জনশ্রুতি থাকলেও বল্লম ডাক্তার বল্লম হাতে চিকিৎসা করতে বেড়িয়েছেন এমন শুনিনি। কিন্তু গাঁয়ের মানুষ প্রদত্ত নামের সাথে সঙ্গতি রেখেই আমার চোখের তারায় জ্বলজ্বল করে জ্বলতো বল্লম হাতে আলোকবর্তিকা হয়ে বের হওয়া সেই লেডি অফ দ্যা ল্যাম্পরূপী বলরাম ডাক্তার।

গাঁয়ে আমাদের থাকা হতো না, বাবার বদলির চাকরি ছিল বলে বাবার সাথে পথে-পথেই পাঁচালী রচনা করে বেড়াতাম। বছরে একবার গ্রামে আসতাম টানা এক মাসের জন্য; স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে। দাদা বাড়ি আর নানা বাড়ি মিলিয়ে কাটানো সেই তিরিশ দিনের বিনিময়ে তখন আমাদের সব ভাইবোনদের এক মাসের ডিজনিল্যান্ডে ছুটি কাটাতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও আমরা নির্দ্বিধায় তা ফিরিয়ে দিতাম নিশ্চয়। সে-সময়গুলোতে মাঝেমাঝে ঝাঁক বেঁধে ডাক্তারবাড়ি যেতাম অট্টই, আমলকী, করমচা আর অড়বড়ইয়ের লোভে। হাতে শাখা আর সিঁথিতে সিঁদুর দেওয়া রমনীগুলোকে গৃহস্থালি কাজকর্ম করতে করতে আমাদের দস্যিপনা খেয়াল করতে দেখলেও, কখনও এই দুষ্টু দলের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে গালাগালি দিতে শুনিনি। উপরন্তু একবার ডাক্তার গিন্নি আমার হাতের মুঠোয় দুটি তিলের নাড়ু গুঁজে দিয়েছিলেন। কী যে লোভনীয় ছিল সেই নাড়ুর সুবাস! স্বাদের কথা আর না-ইবা বললাম। এরপর বহুবার তিলের নাড়ু খেলেও ডাক্তারবাড়ির নাড়ুর মায়াভরা সেই সুবাস আর পাইনি।

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার মাঝামাঝি সময়ে স্থায়ীভাবে ফেনী চলে আসি আমরা। বাবা তখনও চাকরির সিংহল-মালয় পাড়ি দিচ্ছেন, কিন্তু আমরা থিতু হয়েছি। বাবা দূরত্ব অনুযায়ী ৭ কিংবা ১৫ কিংবা ৩০ দিন পর-পর আসেন। আর আমরা বাবাহীন শহরে অবাধ স্বাধীনতার মাঝে লুণ্ঠিত হই। সিরিয়াস শাসন ব্যাপারটা যে কী আমার মা সম্ভবত সেটি জানতেন না।

এ-সময়গুলোতে মা প্রায়ই গ্রামের বাড়ি যেতেন, চালের গুঁড়ো করা, আম-কাঁঠাল-লিচুর ভাগবাটোয়ারা জনিত জটিলতা নিরসনের জন্য। এমনই কোনও এক সকালে— আমি তখন কলেজে পড়ি– মায়ের সঙ্গী আমিও হয়েছিলাম। বাড়ি পৌঁছুতেই খবর পেলাম, বল্লম ডাক্তারের চট্টগ্রামনিবাসী বড় ছেলে আজ ভোররাতে মারা গেছেন, লাশ বাড়িতে আনা হয়েছিল আর দাহকার্যও সম্পন্ন। আমার মা সামাজিকতা রক্ষার্থে ডাক্তারবাড়ির পথ ধরলেন, সাথে আছে আমার খালাতো বোন রিংকু দুঃসম্পর্কের চাচাত ভাই ভুট্টো আর আমি। ইতিপূর্বে ডাক্তার বাড়ি গমন ঘটলেও ডাক্তারের সাথে আমার এই প্রথম সাক্ষাত। আশাহত হলাম। অশীতিপর বৃদ্ধ। হাতে বল্লমের বালাইও নেই। এক হাতে অনেকটা আমাদের তসবির মতো দেখতে একটি মালা পেঁচিয়ে কী সব জপছেন বিড়বিড় করে। সম্ভবত “হরে কৃষ্ণ হরে রাম।” এই অবস্থাতেও হাসি পেল। সেই সময় সকলের মাঝে অসাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি থাকলেও অন্য ধর্ম নিয়ে উপহাস করাটা দোষের মধ্যে ছিল না। এ নিয়ে কখনও বিশালাকার গণ্ডগোল হতেও শুনিনি। কেননা, আমাদের নীচতলার ভাড়াটে অনিমা দিদির বৃদ্ধ পিসিকে যখন “হরে কৃষ্ণ হরে রাম” বলতে শুনতাম তখন “হরে কৃষ্ণ হরে রাম, কৃষ্ণ হাদে ধাম ধাম!” বলে তাঁকে ভেংচি কাটতে মোটেও কুণ্ঠিত হতাম না। কিংবা দোতলার ভাড়াটে তৃণাকে যখন ক্ষেপাতাম,

“তিনা রানি ঘোষ

দশ ফাই দি কাঁডল আইনছে

কাঁডলে নাই কোষ

তিনার বাপে হাদে টোশ টোশ!”

তখনও বিমলানন্দ উপভোগ করতাম। এবং সেই বৃদ্ধ পিসি কিংবা কিশোরী তৃণা রাগে ক্যাঁ ক্যাঁ করে উঠলেও তৃণার বাবা প্রায়শই প্রশ্রয়ের হাসি হেসে বলতেন,”এরে হোলা-মাইয়াঅগল, তোরা ভদ্র অইবি কবে!” এসব নিয়ে পরিবারে কখনও নালিশ আসেনি। তৃণা রানি ওরফে ত্রিবেনী ঘোষ তৃণা অবশ্য মাফ দেয়নি। দরবারে দরবারে বিচার চেয়ে বেড়িয়েছে। আমরা কৃষ্ণ তাড়িত বায়ু নিয়ে ছড়া গাঁথলেও লক্ষ্মীপূজার আগের রাতে অনিমা-নীলিমাদিদি, তৃণা, মণি, সুমন, মিশু, সরোজ-বিদ্যুৎদাদের সাথে এক হয়ে ভেজানো চালের কাইয়ে মুঠি চুবিয়ে মেঝেতে ছাপ দিয়ে ফুটিয়ে তুলতাম লক্ষ্মীর পায়ের পাতা। ঐ পাতলা আটার গোলায় তর্জনী চুবিয়ে-চুবিয়ে সেই পায়ের পাতার আগায় পাঁচটি ফোঁটা দিয়ে লক্ষ্মীর সম্পূর্ণ পায়ের ছাপ যখন স্পষ্ট করে তুলছি তখন একবার বাবা বলে উঠেছিলেন, “বাহ! মনে হইতেসে হাচা-হাচাই বুঝি লক্ষ্মী সারা বাড়ি ঘুরি গেছে।” দীপাবলির দিন শত-শত প্রদীপে সিঁড়ি আর ছাদ আলোকিত করে তুলতাম। আশ্বিনী পূজার সকালে আমার মা নাশতা বানাতেন না; কারণ এটা তো জানাই আছে, সব ভাড়াটেরাই বতেভাত(আতপ চালের পান্তাভাত), কোরানো নারকেল আর পাটালিগুড় পাঠাবে। বতেভাত নিয়ে একটা জনশ্রুতি ছিল তখন, হিন্দুরা এই ভাত আশ্বিনে রাঁধে আর কার্ত্তিকে খায়। ছেলেবেলায় বেশ অবাক হতুম এক মাস আগের রান্না ভাত কীভাবে এতদিন ভালো থাকতে পারে এই ভেবে! খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ব্যাপারটি আমার কাছে খোলাসা হয়েছে যে আশ্বিনের শেষ রাতে রাঁধা ভাত কার্ত্তিকের প্রথম সকালে খাওয়ার মধ্যেই ছিল “আশ্বিনে রেঁধে কার্ত্তিকে খাওয়ার” নিহিতার্থ।

চৈত্র সংক্রান্তির দুপুরে হয়তো একটা তরকারিই রাঁধতেন মা, প্রতিবেশীদের পাঠানো পাঁচনে আমরা খেয়েও ফ্রিজ ভরে যাবে বলে। তাই বলে রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কের মশকরা কিংবা লাল আর কালো পিঁপড়ে নিয়ে হিন্দু-মুসলমান সম্পৃক্ত দ্বন্দ্ব যে তখনও ছিল না, তা কিন্তু নয়। এই নিষাদ জাতির একাংশকে বখতিয়ার খিলজি তার বিশাল হাতের থাবায় মুসলমানে পরিণত করে গেছেন এবং কালের প্রবাহমানতায় নিজেদের প্রাচীন অবস্থা ভুলে তারা আজ এতটাই মুসলমান হয়ে উঠেছে যে সনাতন ধর্ম নিয়ে সামান্য ঠাট্টাতামাশাকে তারা ইবাদতের অংশ মনে না করলেও অনৈতিক মনে করছে না। আর আমিও তাই বহু শতাব্দী ধরে লালিত সংস্কারের কারণেই বল্লম ডাক্তাদেরকে কৃষ্ণনাম আউড়াতে দেখে আনমনেই বিড়বিড় করে উঠলাম, “হরে কৃষ্ণ হরে রাম, কৃষ্ণ…. ধাম ধাম!”

বৈঠকখানায় আমাদের বসার ব্যবস্থা করে ডাক্তার নিজেও বসলেন। মা ডাক্তারকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন মনে হয়, আমি সেই কথায় কান না দিয়ে ঘরের ভেতরে সেল্ফে সাজানো আগামাথাহীন সারিসারি বই আমার কোনও কাজে আসবে না টের পেয়ে বৈঠকখানার খোলা দরজাটি দিয়ে বাড়িটাকে এক প্রস্থ দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছি। সুবিশাল আঙিনাকে যেন আগলে রেখেছে আম-কাঁঠাল-লিচু-নারকেলসহ বিভিন্ন গাছ। হরিতকী, বহেড়াগুলোও বহাল তবিয়তে আছে দেখছি । আরও নাম না জানা কিছু গাছ দেখলাম এবার, ঔষধি হবে নিশ্চয়। ডাক্তারের কথায় দৃষ্টি ঘরে ফেরালাম। উনি ভুট্টোর সাথে কথা বলছেন-“তোর নাম কিয়ারে?”

-“ভুট্টো”

– “এমা! এতে কিয়া কয়! জুলফিকার আলী ভুট্টো নি কনো?”

-“জ্বে না, আমার নাম এমরান হোসেন ভুট্টো।”

-“তাইলে তুই এমরান হোসেন ভুট্টো, জুলফিকার আলীর ভুট্টোর দোসর, হাচানি!”

-“জ্বে না, তেনার সাথে আমার কখনও পরিচয় গটে নাই।” ভুট্টো প্রমিত ভাষায় কথা বলার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করে যায়। অনাত্মীয় সম্মানীত ব্যক্তিদের সম্মানার্থে তাঁদের সাথে প্রমিত ভাষায় কথা বলার চেষ্টার রেওয়াজ এখনও আমাদের গাঁয়ে আছে। রেওয়াজ রক্ষায় ভুট্টোর সেই শ্রম এবং তার আচাভুয়া-বোম্বাচাক অবস্থা আমাদের বিপাকে ফেলে দিল। আমরা প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছি হাসি থামাতে। মরা বাড়ি, মানুষ কী ভাববে! ওদের কি আর বোঝানো যাবে মরার পিতাই রঙ্গ-রসের হেতু!

-“তুই কোন কেলাশে হরস?” যেন ভুট্টোকে নিয়ে ডাক্তারের আগ্রহের শেষ নেই।

-“সিক্সে”

-“দে, সিক্স বানানি কর।”

এতদিন পর আমি ধরতে পারলাম গজেন্দ্রকাকার বানান ধরার শানেনজুল। ব্যাপারটি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। ওদিকে এমরান হোসেন ভুট্টোর কান লাল হয়ে পাকা টমেটো! সে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আথালিপাথালি করে হাতড়ে বেড়াতে বেড়াতে বলে যাচ্ছে,”এস আই উম্মম…. এস আই এঁ্য.া..এস আই…!” আমি হলপ করে ভাবতে পারছিলাম যে ও তখন মনে-মনে বলছে, “কিল্লাই আইলাম! এরে…কিল্লাই আইলাম এট্টে!!” পরে শুনেছি ভুট্টো নাকি তখন এস এবং এক্স-এর ডিলেমায় ভুগছিল।

ভুট্টোর সিদ্ধান্তহীনতা এতক্ষণে আমাদের ত্রিমূর্তিকে রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য করল। আটকে থাকা হাসি ফোয়ারা হয়ে নিপতিত হচ্ছে, মা আমার আর রিংকুর দিকে গরম চোখে তাকাচ্ছেন হাসি বন্ধ করতে, কিন্তু তাঁর মুখের চাপা হাসিতে আমাদের হাসি লাই পেয়ে শাসনের বাঁধ ভেঙ্গে উথলে পড়ছিল যেন। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, আজ ভোরে ওনার ছেলে মারা গেলেন আর উনি এমন স্বাভাবিক!

বুঝলাম এই বিশাল জীবনের পূর্বেকার আভিজাত্য আর সম্মানের পরিপূরকে বর্তমানের ভগ্নদশাকে সাথে নিয়ে জীবন-সায়াহ্নে এসে তাঁর স্বাভাবিক থাকা ছাড়া আর গত্যন্তর নেই হয়তো— গাঁয়ে-গাঁয়ে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, ডাক্তারবাড়িতে আগের মতো আর হল্লা লেগে থাকে না রোগীদের; ডাক্তারের সুযোগ্য শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা অধিকাংশই শহরমুখী।

পায়েসান্ন খাওয়ার জন্য ভেতরবাড়িতে ডাক পড়ল। দাওয়ায় মৃত ছেলের কিশোরী মেয়ে তন্বিকে দেখছি হাঁ করে ঘুমোচ্ছে। শুকিয়ে যাওয়া চোখের জল আর মুখের লালা মিলেমিশে একাকার। ডাক্তার গিন্নিকে দেখলাম খুব স্বাভাবিক। ছেলেবউকে দেখলাম; পরনে শাদা থান থাকলেও কিংবা সিঁথির টকটকে সিঁদুর মুছে দেওয়া হলেও সেটির লালচে রেশ বেশ বলে দিচ্ছে ইনি সদ্য বিধবা হয়েছেন। ভদ্রমহিলা কথাটতা বলছেন না তেমন, তবে কান্নাকাটিও নেই। কারুকার্য করা আসনে বসে ঘন দুধের পায়েস খেতে-খেতে সেই বয়সেই বিশাল এক দার্শনিক তত্ত্বের উদয় হল মাথায়, শোক-তাপেরও পরিসীমা আছে।

ফেরার পথে বল্লম ডাক্তার এক জোড়া নারকেল দিলেন আমাদের। গাঁয়ের অবস্থাপন্ন মানুষদের প্রাচীন প্রথা; অতিথিকে খালি হাতে যেতে দেওয়া হয় না। ভুট্টো বুড়ো না শুনে মতে “ফি নাহারে জাহান্নামে খালেদুন” এর গ্রাম্যভাষ “জাহান্নামের বলা হিন্নমে যক” বলে জোড়া নারকেল কাঁধে ঝুলিয়ে লেফটরাইট করতে করতে আগে-আগে হাঁটা দিয়েছে। তার এই গমনদৃশ্য নিয়ে পরবর্তী বহুকাল পর্যন্ত তাকে উপহাসের পাত্র হতে হয়েছে আমার গোটা গোষ্ঠীর কাছে।

বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখলাম, পুকুর পাড়ে চিতাটায় এখনও ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে। ভুট্টো বলল, “এহহে রে… আগুন নিবলে এককানি আঁতাই চাইতে হাইত্যাম!” আমার জিজ্ঞাসু চোখের জবাবে উত্তর দিল, “ওম্মা! আমনে জানেন না বুঝি, ইন্দুরা মরা হুইবার সময় হোনাদানা খুলি দেয় চিতাত!” মায়ের সমর্থন পেয়ে আমার অবিশ্বাসীভঙ্গির প্রতুত্তরে এবার সে জোড়ালো গলায় বলে উঠল, “বুইয়ার হুতের বউরে কানের আর গলার হোনা খুলি চিতাত হালাইতে আঁই নিজের চোখে দেইখসি! চাইয়েন, আইজ্যা রাইচ্যা তিন-চাইর চোর ঢুশাঢুশি লাগাইব হোনার লাই ছালি আঁতাইতো আই চিতাত।” আমাদের কল্পনায় ভেসে ওঠে চার চোরের মিলন এবং তৎপরবর্তী বিশৃঙ্খলা। আমাদের সম্মিলিত হাহাহা হিহিহি রবে পাশের কৃষ্ণচূড়া থেকে এক ঝাঁক শালিক উড়ে পালায় তৎক্ষণাৎ।

পুল পেড়িয়ে, কাদামাখা আলপথ ধরে, বাঁশের সাঁকোয় ক্যাঁচরম্যাচর শব্দ তুলে, খালপাড়ের চোরাকাঁটার নূপুর পায়ে জড়িয়ে মেঠোপথে উঠতে উঠতে কত নাম জানা ফুলের দেখা মিলছিল! শুধু কচুর ফুলগুলো মায়ের চোখে পড়ছিল, শুটকি দিয়ে কচুর হুলার চচ্চড়ি আমার মায়ের প্রিয় খাবার। যেই চোখে পড়ে ওমনি বলে উঠেন,”এ-রে ভুট্টারে…এ-রে শিলুরে… এ-রে রিংকুরে…এ-রে লস্যারে..” আমি আর রিংকু ফুলে টান মারি আর মায়ের উপর বিরক্ত হয়ে বলি, “হুলা রে…হুলা…!” শুধু নারকেল কাঁধে এমরান হোসেন ভুট্টোর ডাক্তারের উপর রাগ তখনও পড়েনি। সে কচুর ফুলে ঘ্যাঁচ করে টান মারে আর আয়েশ করে ছড়া কাটে,

“জগন্নাথ জগন্নাথ কী ফুজা করো?

সাতটি কলা মুখে দিয়ে নমস্কার করো!

ডাক্তারবাবু ডাক্তারবাবু জলে নাইম্যেন না

এচিং বেচিং তেচিং দিব

উইঠতে ফাইরবেন না!”

সেই গোধূলিলগ্নে আমরা হাতেপায়ে কচুপাতার চুল্কানি আর কোচর ভর্তি করে ফুল নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। সেই বেলায় আমাদের চলার পথ ম ম করছিল কচুফুলের সৌরভে।

বলরাম ডাক্তার মারা গেছেন বহু বছর! একে-একে তাঁর ছেলেরাও মারা যাচ্ছেন হয়তো। কিন্তু আজ গজেন্দ্রকাকার মৃত্যু সংবাদের চেয়ে “গজেন্দ্রবাবু” নামটিই যেন প্রকট হয়ে ওঠল আমার কাছে। বহু দিনের বহু পুরোনো সেই কচুফুলের সৌরভে ভরে উঠল আমার শহুরে ঘর। বল্লম ডাক্তারের হাতের জপের মালা, সেল্ফের সারি-সারি বই, অট্টই আর অড়বড়ই বিছানো বাগানপথ,গজেন্দ্রকাকার ধবধবে ধুতি, তাঁর বানান শেখানোর পদ্ধতি: লেফট্যান্ট-এর বেলায় মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া, কিংবা এল দুইটা দিলেই যে পিলার পোক্ত হয় না,  সোনালিতে দীর্ঘ-ই কার দিলেই স্বর্ণের রঙ যে গাঢ় হয়ে যায় না ইত্যাদি, মুক্তার মতো তাঁর হাতের সেই লেখা, মোহাবিষ্ট করে ফেলার মতো গল্পের আসরকেন্দ্রিক স্মৃতিগুলো ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগল মনের উঠোনে। আনমনে ভাবছি— অবান্তর ভাবনা— কাকা চলে গেলেন, গাঁয়ের ছেলেগুলোকে বানান শেখাবে কে? পরমুহূর্তেই আশ্বস্ত হলাম, “গুগল স্পেল-বাইন্ডার” আছে না! ইন্টারনেটের স্রোতে উচ্ছ্বাসিত এখনকার গ্রাম, হাতে-হাতে ঘোরে স্মার্টফোন।

বাবার সাথে কথা সেরে স্বাভাবিকভাবেই নিজের কাজে মন দিলাম। প্রচুর কাজ জমে ছিল, আমার স্মৃতিকাতর হওয়ার সুযোগ নেই তেমন। তাক থেকে নামিয়ে নিলাম এক বান্ডেল খাতা, আগামীকালই জমা দিতে হবে সেগুলো। খাতা দেখার টেনশনের তোড়ে এক ছুটে ঘর ছেড়ে পালিয়েছে অতীতদিনের কচুফুলের সুবাস। খুব খেয়াল করলে হয়তো টের পেতাম, একটা দীর্ঘশ্বাস তার বিসর্গের স্থিতি-অস্থিতির দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে বিব্রতভাবে আড়াআড়ি ঝুলছে ঘরের মাঝ বরাবর।